আল্লামা শফির বক্তব্য নিয়ে বেশ ভালোই তোলপাড় হচ্ছে

জাতীয়

আল্লামা শফির বক্তব্য নিয়ে বেশ ভালোই তোলপাড় হচ্ছে। পক্ষে বিপক্ষে অনেক লেখা দেখছি। নিঃসন্দেহে উনার বক্তব্য ইসলামপ্রিয় মানুষদের বিশাল একটা অংশকে আহত করেছে যাদের হৃদয়ে শাপলার স্মৃতি ও শাপলা পরবর্তী উল্লাস এখনো তাজা আছে। যারা কওমি মাদ্রাসার সাথে যুক্ত না, বিনা শর্তে কোন নির্দিষ্ট দল, গোষ্ঠী বা ব্যক্তিবর্গের পক্ষে সবসময় সাফাই গাওয়ার আদর্শে বিশ্বাসী না, ‘আকাবীর যাই করুক তাঁর কাজ সঠিক’ এই ধরনের চিন্তাধারা যারা রাখেন না, কিন্তু ইসলাম ও রাসূলুল্লাহ্ ﷺ এর পক্ষে অবস্থান নেয়ার কারণে আল্লামা শফি ও হেফাযতে ইসলামকে সম্মান ও পছন্দ করা অনেকেই এ ঘটনার পর হয়তো তাঁদের ওপর আস্থা পুরোপুরি হারিয়ে ফেলেছেন বা ফেলার পথে। আর সত্যি বলতে কি আমি তাঁদেরকে খুব একটা দোষও দিতে পারছি না। তবে একথাও সত্য যে ‘তেতুল’-এর মতো এক্ষেত্রেও উনার বক্তব্যকে অনেকেই কিছুটা বিকৃত করে উপস্থাপন করছে। অনলাইনের অনেক লেখালেখি দেখে মনে হতে পারে যে উনি বলেছেন – আওয়ামী লীগ মোটা অংকের টাকা দেয় তাই আওয়ামী লীগ হতে সমস্যা নেই – যদিও তিনি আসলে যা বলেছেন তার সাথে এই অতি সরলীকরণের বেশ পার্থক্য আছে।
.
প্রকৃত বক্তব্য, উপস্থাপিত বক্তব্য, বক্তব্যের সাফাই, বক্তব্যদের খন্ডন, সনদ-স্বীকৃতি সব মিলিয়ে বেশ পুরো আলোচনায় ভালো রকমের একটা গন্ডগোল লেগে গেছে। কিন্তু সনদের স্বীকৃতি আর হেফাযতে ইসলামের বর্তমান অবস্থানকে একইসাথে মিলিয়ে দেখা কিছুটা হলেও ভুল। সনদ কওমি মাদ্রাসার ছাত্রদের জন্য একটি প্রয়োজন, আর যারা দিচ্ছে তাদের জন্য এটি একটি উপকরণ। দেয়া হচ্ছে কারণ তারা মনে করছে (সঠিকভাবে) এর মাধ্যমে কিছু অর্জন করা যাবে। বাধ্য হয়ে, চাপে পড়ে দিচ্ছে না, স্বেচ্ছায়; বলা যায় স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে দিচ্ছে। সুতরাং সনদ এখানে সেকেন্ডারি পয়েন্ট। সনদ স্বীকৃতির সিদ্ধান্ত হল কিছু হিসেবনিকেশের ফল, কিন্তু এর শেকড় কোথায়? আল্লামা শফি বলেছেন – কেউ কেউ বলে আমি আওয়ামী লীগ হইয়া গেছি। কমবখতো মিথ্যা কথা বইলতেছো – কেউ কেউ কেন একথা বলছেন আর কেন-ই-বা মুখে না বললেও বাংলাদেশের বিশাল সংখ্যক মানুষ নানা মাত্রায় একথা বিশ্বাস করছেন, এর মাঝেই লুকিয়ে আছে শেকড়। নিজের প্রাপ্র্য আদায় কিংবা গ্রহনে কোন দোষ নেই, কিন্তু সনদ দেয়া হলে যে কিছু পাবার আছে – দাতাদের একথা মনে হবার কারন ও কী কী আসলে পাওয়ার আছে, তার মধ্যে মূল বিষয়টা লুকিয়ে আছে। আর একথা কোনভাবেই স্বীকার করা সম্ভব না যে যারাই বর্তমান অবস্থায় হেফাযতে ইসলামের নেতৃবৃন্দের সমালোচনা বা বিরোধিতা করছেন তাঁরা সবাই কোন না কোন উদ্দেশ্য (রাজনৈতিক কিংবা ব্যক্তিগত) হাসিলের জন্য, কিংবা হিংসা-বিদ্বেষের কারণে এমনটা করছেন। সাফাই দিতে গিয়ে যতোই আমাদের কওমি ভাইরা বাকি সব মুসলিমের আন্তরিকতা এবং উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলুন না কেন। ইন ফ্যাক্ট পুরো আলোচনার সবচেয়ে দুঃখজনক দিকগুলোর একটি হল ‘কওমি না’,’দেওবন্দি না’ এমন যে কারো বিরোধিতা বা সমালোচনার পেছনে নিয়্যাত নিয়ে অবলীলায় প্রশ্ন তোলার ব্যাপারে তাঁদের সক্ষমতা ও উন্মুখতা।
.
নিয়্যাত নিয়ে প্রশ্ন না তুললেও একটি প্রশ্ন তোলাই যায়, আর তা হল হেফাযতের সমালোচনার ক্ষেত্রে (প্রশংসা ও পক্ষাপাতের মতোই) এতো তীব্রতা কেন? এর একটি সম্ভাব্য কারণ হল হেফাযতে ইসলাম ও কওমি অঙ্গনের ভূমিকা ও সক্ষমতাকে ঠিকভাবে বুঝতে না পারা – আন্ডার বা ওভারএস্টিমেট করা। বর্তমান এ তর্কবিতর্কে পক্ষবিপক্ষের আলোচনা থেকে যেটা স্পষ্ট তা হল, বাংলাদেশে কওমি মাদ্রাসাকেন্দ্রিক আলিম ও তালিবুল ইলমগণ একটা মাইনরিটি গোষ্ঠী। ও্যেল ইন্টিগ্রেইটেড মাইনইরিটি, কিন্তু মাইনরিটি নান দা লেস। কোন অর্থে মাইনরিটি? যে অর্থে কোটা আন্দোলনকারীরা মাইনরিটি। কোটা আন্দোলনকারীদের মধ্যে সমাজের প্রায় সব তলার পরিবারের সন্তানেরা আছে, সাধারণ মানুষের এর প্রতি একটা সমর্থনও আছে, কিন্তু দিনশেষে তাঁদের এজেন্ডা একটা নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর মধ্যে ফোকাসড। একই কথা কওমি অঙ্গনের ক্ষেত্রেও বলা যায়। তাঁদের ফোকাস হল মাদ্রাসা ও খানকাহর সুরক্ষা, এই অঙ্গনের ছাত্র ও শিক্ষকদের জন্য অধিকার আদায় ইত্যাদি। অর্থাৎ তাঁরা নিজ গোষ্ঠীস্বার্থকেন্দ্রিক আদর্শ ও উদ্দেশ্য নিয়ে মূলত ফোকাসড। সাধারণ মানুষের এতে সমর্থন থাকতে পারে, কিন্তু সাধারণ মানুষ এ নিয়ে তেমন একটা কনসার্নড না। এক্ষেত্রে আমার কথা গ্রহণ করার দরকার নেই। যারা আল্লামা শফি, হেফাযতে ইসলাম ও সনদের পক্ষে লেখালেখি করেছেন তাঁদের লেখাতেই এটা দেখতে পাবেন। আদর্শিক বিচ্যুতির ব্যাপারে ওঠা প্রশ্নের জবাব তারা সবাই দিয়েছেন ‘প্রয়োজন’, ‘অস্তিত্ব রক্ষা’ ইত্যাদির যুক্তি দিয়ে।
.
এর পাশাপাশি আরেকটি লক্ষনীয় বিষয় হল তাঁরা নিজেদের মূল জনগোষ্ঠী থেকে বিচ্ছিন্ন আলাদা একটি গোষ্ঠী হিসেবেই দেখেন। বর্তমান তর্ক-বিতর্কে যারা আল্লামা শফির পক্ষে বলেছেন বা হেফাযতের সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতা প্রমাণ করার চেষ্টা করেছেন তাঁদের বক্তব্যে আবারও এই পয়েন্টটা ঘুরেফিরে বারবার এসেছে। ‘এটা আমাদের ইস্যু। আমরা ভালো বুঝবো। এ নিয়ে তোমাদের কথা বলার অধিকার নেই। তোমরা কোনদিনও ‘আমাদের’ ছিলে না। তোমরা কোনদিনই শুভকাংক্ষী ছিলে না।‘ যারাই সমালোচনা করছে তাঁরাই সুযোগসন্ধানী! হিংসুক!। এ বিষয়ে আমি আগে কিছুটা লিখেছিলাম, সেটা দেখতে পারেন – https://bit.ly/2zWWm3k
.
যদিও তাঁদের অনেকে মূলধারা হবার দাবি করেন কিন্তু বাস্তবতা হল তাঁরা মূলধারা নন। আর মূলধারা না হবার কারণেই তাঁদের সাথে এধরনের বারগেইনিং এ যাওয়া সম্ভব হচ্ছে। তাঁরা নিয়ন্ত্রন করেন না, নিয়ন্ত্রিত হন। অথবা সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক-নিয়ন্ত্রিতের ডায়নামিক্স থেকে গা বাচিয়ে চলেন। আর এসব কারনেই কোণ আগাম বিপ্লবের স্বপ্ন হেফাযতে ইসলামকে ঘিরে দেখা উচিৎ না। হেফাযত যা করেছে এর চেয়ে বেশি কিছু তাঁদের কাছ থেকে আশা না করাই ভালো হবে। একটি মাইনরিটি গ্রুপের প্রতিনিধি হিসেবে তাঁরা বেশি থেকে বেশি অধিকার আদায়ের আন্দোলন করতে পারেন। কিন্তু কোন কোন আদর্শিক জাগরণের দিকনির্দেশনা তাঁদের কাছ থেকে পাওয়া যাবে না। পাশাপাশি আরেকটি বাস্তবতা যেটা মেনে নিলে হেফাযতে ইসলামের সমালোচনার ক্ষেত্রে ঝাল ও তীব্রতা কিছুটা কমবে সেটা হল – হেফাযতের উচ্চপর্যায়ে সিগ্নিফিক্যান্ট একটা অংশ কম্প্রোমাইযড। তারা নীতি দ্বারা না, স্বার্থ দ্বারা চালিত হচ্ছেন। যদিও কওমিদের অধিকাংশই এমন নন, কিন্তু নিয়ন্ত্রণ এই কম্প্রোমাইযড অংশের হাতে। এবং তাঁদের বিরোধিতা করে কোন আমূল পরিবর্তন আনার মতো একতাবদ্ধ শক্তি দেখা যাচ্ছে না। অন্তত নিকট ভবিষ্যতে। এই বিষয়গুলো বুঝতে পারলে হেফাযতে ইসলাম ও কওমি অঙ্গন থেকে ভবিষ্যতে কী ধরনের আন্দোলন বা পদক্ষেপ আশা করা যাতে পারে সে ব্যাপারে আশা করি তুলনামূলকভাবে বাস্তবতসম্মত এস্টিমেট করা সম্ভব হবে। এবং তাঁদের প্রশংসা ও সমালোচনায় ভারসাম্য বজায় রাখা সহজ হবে।
.
তবে কওমি তরুণদের একাংশের চিন্তার সাথে এই কম্প্রোমাইযড অংশ ও এই কম্প্রোমাইযড অংশকে সক্রিয় সাপোর্ট না দিলেও, তাদের বিরোধিতা না করা বড়-দের আদর্শিক ও চিন্তাগত ফারাক দিন দিন বাড়ছে। এই প্রতিটি অংশ নিজেদের দেওবন্দের প্রকৃত চেতনার অনুসারী বলে দাবি করেন। কিন্তু স্পষ্টতই এই সাংঘর্ষিক দাবিগুলোর সবগুলো একইসাথে সত্য হতে পারে না। কওমিবিদ্বেষ বা অন্য ঘরানার সাথে কওমি অঙ্গনের বোঝাপরার চাইতে বরং আগামীর ইন্টারেস্টিং ডেভেলপমেন্টগুলোর একটি হতে পারে এই ফারাকের সুরাহা কিভাবে হবে সেই প্রশ্ন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *