মুসলিম বীর সেনা সালাউদ্দিনের দিনগুলো

১১৭৬ সাল—

গ্রীষ্মের কোন এক ভ্যাপসা বিকেলে মুখোমুখী বসা দু’জন প্রতাপশালী আমীর৷ দিগন্তে সূর্য তার তেজ কমিয়ে নারকেলপাতার গা ছুঁয়ে নেমে যাচ্ছে অজানায়৷ আলেপ্পোর আমিরের সাথে নির্ধারিত কালের জন্য যুদ্ধ বন্ধের সন্ধিপত্রে সাক্ষর করলেন সুলতান সালাহউদ্দিন৷ বাতাসের কান বেয়ে সন্ধির সংবাদ পৌঁছে গেলো মসুলের গভর্নর সাইফুদ্দিন গাজী ইবনে মাওরিদের কাছে৷ সন্ধির খবর শোনামাত্রই সে কপাল কুঁচকে নিলো, ঠাট্টাচ্ছলে আলেপ্পোবাসীদের তিরষ্কারে মেতে উঠলো৷ ঝাঁঝালো গলায় বললো, সালাহউদ্দিনের সাথে সন্ধিতে তারা বড্ড তাড়াহুড়ো করে ফেলেছে; এটা বরং তাদের আত্মমর্যাদাহীনতার দলিল৷

সাইফুদ্দিন গাজী জানতো সুলতান সালাহউদ্দিনকে সে একা দমাতে পারবে না৷ সুলতানের সৈন্য-সামন্তের সামনে দাঁড়ানোর ক্ষমতা তার নেই৷ আগ-পাছ ভেবে তার মাথায় এক কূট বুদ্ধি চাপলো৷ একই সময়ে দু’টি পত্র লিখিয়ে নির্ভরযোগ্য দূত রওনা করালো সে৷ একটা চিঠি যাবে আলেপ্পোর রাজদরবারে, সুলতানের সাথে করা সন্ধি ভঙ্গ করে তাঁর বিরুদ্ধে সহসা যুদ্ধে নামার লিখিত চুক্তিপত্র প্রেরণের আবেদন রয়েছে তাতে৷ দ্বিতীয় চিঠিটি যাবে দামেশকের দিকে, সুলতান সালাহুদ্দিনের কাছে৷ এ চিঠিতে রয়েছে সুলতানের কাছে নিরাপত্তার অনুরোধ, নির্দিষ্টকালের জন্য সুলতানের আক্রোশ থেকে বাঁচার আকুতি লিখে পাঠিয়েছে মসুলের আমির৷

কিন্তু ভাগ্য সাইফুদ্দিন গাজীর সহায় হলো না৷ আলেপ্পোর আমিরের কাছ থেকে নতুন চুক্তিপত্র সমেত ফিরে সুলতানের দরবারে পৌঁছে কুদরত-বিড়ম্বনায় তার দূত বিরাট ভুল করে বসলো৷ সুলতানের নামে লিখিত পত্রের পরিবর্তে মসুলের আমিরের চিঠির জবাবে লেখা আলেপ্পোশাহির চিঠি বের করে সুলতানের হাতে তুলে দিলো সে, যেখানে তার বিপক্ষে ষড়যন্ত্রমূলক যুদ্ধচুক্তির কথা লেখা ছিলো৷ সুলতান নীরবে পুরো চিঠিটা পড়লেন৷ কোনরূপ প্রতিক্রিয়া ছাড়াই সেটা দূতের হাতে ফিরিয়ে দিলেন তিনি৷ গম্ভীর কণ্ঠে বললেন, মনে হয় চিঠি পরিবর্তন হয়ে গেছে; একটু খুলে দেখোতো!

দূত হাতের চিঠিটা খুলেই দরদর করে ঘামতে লাগলো৷ বুঝতে পারলো যে ভুল সে করেছে, সে ভুলের মার্জনা নেই৷ দরবারের বাকিরা বিমূঢ় বসা৷ পিনপতন নীরবতা পুরো মহলজুড়ে৷ মসুলের দূতের বুকে শঙ্কা খচখচ করছে৷ আনত নয়নে সে ঘনঘন দু’চোখের পাতা উল্টাচ্ছে৷ নীরবতা ভেঙে সুলতান বললেন, আচ্ছা আলেপ্পোর অধিবাসীরা সাইফুদ্দিনের সাথে আমার বিপক্ষে নতুন করে যুদ্ধের চুক্তি কীভাবে করতে পারে; অথচ তাদের সাথে সন্ধিচুক্তির পূর্বশত ছিলো, তারা আমাদের অগোচরে কোন বিষয়ে সিদ্ধান্তে আসবে না; আমাদের অনুমতি ছাড়া কোন নতুন চুক্তিতেও সই করবে না! কাঁপা কাঁপা গলায় দূত বললো, ইতিমধ্যে তারা আপনার সাথে করা চুক্তি ভঙ্গ করেছে৷

সুলতান মসনদে ঠেস দিয়ে বসলেন, তার চেহারায় চিন্তার ভাঁজ৷ তিনি বুঝতে পারলেন ইসলামি সাম্রাজ্যের বিস্তৃতি বাড়ানো দরকার৷ সাথে সাথে মিশরের অধিপতি (সুলতানের ভাই) আল-মালিকুল আদিলের কাছে বার্তা পাঠালেন, এখুনি যেন যুদ্ধের প্রস্তুতি নিয়ে সৈন্য-সামন্তসহ বেরিয়ে পড়েন৷

৫৭১ হিজরির শাওয়াল চলছে তখন; ১১৭৬ খ্রিস্টাব্দের ফেব্রুয়ারি মাস৷ সুলতান তার বাহিনী নিয়ে আলেপ্পোর দিকে ঘোড়া ছুটালেন৷ উত্তর সিরিয়ায় আবু কুবাইস গোত্রের বাগানে গিয়ে কাফেলা যাত্রাবিরতি করলো৷ সুলতানের সৈন্য সংখ্যা তখন ছয় হাজারের কাছাকাছি৷ ওদিকে আলেপ্পো ও মসুলের দরবারে খবর চলে গেছে৷ বিশ হাজার সৈন্যের বহর নিয়ে তারা এগিয়ে আসছে৷ যুদ্ধে জনবল বাড়াতে কারাগারের বন্দিদের মুক্ত করে সঙ্গে নিয়ে এসেছে তারা৷ সুলতান অরন্টিস নদি পেরিয়ে সিরিয়ার সীমান্তে ঢুকলেন৷ আলেপ্পো শহরঘেঁষা সিরিয়ার উত্তরাঞ্চলের তিল-সুলতান নামক স্থানে তাঁবু ফেললো তার সৈন্যরা৷

১১৭৬ সালের এপ্রিলের কথা বলছি৷ যুদ্ধের এক পর্যায়ে খাদ্য ও পানীয়ের অভাবে সুলতান ও তার সৈন্যরা ক্লান্ত এবং তৃষ্ণাকাতর হয়ে পড়েছে৷ দৈহিক অবসাদে মাটির দিকে নুয়ে পড়ছে যেন৷ ক্লান্তি ও পিপাসার প্রকটে নড়বার ক্ষমতাটুকুও বাকি নেই তাদের৷ গোয়েন্দা মারফত সংবাদ গেলো মসুলের আমিরের কানে৷ উপস্থিতরা সাইফুদ্দিনকে উস্কে তুললো এই অবস্থায় সুলতানের উপর ঝাঁপিয়ে পড়তে, যেন অল্পতে তার অস্তিত্ব মিটিয়ে দেয়া যায়৷ সাইফুদ্দিন তাতে সম্মত হলো না৷ সে বললো, কাল ময়দানে ফায়সালা হবে৷ সালাহউদ্দিনের মতো বীরকে এভাবে মেরে শান্তি নেই৷ দিনের আলোতে যুদ্ধ করে তার বিপক্ষে জয়ী হবো আমরা৷ মূলত আল্লাহ শত্রুপক্ষের সহায় ছিলেন না, নতুবা এমন সুযোগ তারা হাতছাড়া করতো না৷

এদিকে সহসা আকাশে মেঘ জমে এসেছে, মুষলধারে বৃষ্টি হয়ে আশেপাশের নহরগুলো পানিতে ভরে গেছে৷ সুলতানের ঘোড়াগুলি পানি পেয়ে তৃপ্ত হয়ে উঠেছে৷ সৈন্যরা উদ্যম ফিরে পেয়ে পূনরায় ময়দানে সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে গেছে৷ বাজপাখীর মতো তারা হামলে পড়েছে শত্রুপক্ষের শিবিরে৷ আলেপ্পো-মসুলের সৈন্যদের হৃদয়ে কাঁপন ধরে গেলো সে হামলায়৷ সাইফুদ্দিন গাজীসহ সিংহভাগ সৈন্যরা পড়ি মরি করে ময়দান ত্যাগ করলো৷ বাকিদের কতেকে বন্দি হলো, কতেকের কর্তিত দেহ বালু মেখে পড়ে রইলো রণক্ষেত্রের এদিক-সেদিকে৷

যুদ্ধ শেষে সালাহউদ্দিন তাঁবুতে ফিরে এলেন৷ বন্দি হওয়া আলেপ্পো ও মসুলের আমিরেরা ক্ষমা প্রার্থনা করলে তিনি তাদের প্রতি দয়াপরবশ হলেন৷ পাশাপাশি বিভিন্ন উপঢৌকন দিয়ে তাদেরকে সম্মানিত করলেন৷ শত্রুপক্ষ গনিমত হিসেবে ময়দানে বহু সম্পদ ফেলে গেছে৷ সুলতান সেগুলো আনতে বললেন৷ সেখানে ধনরত্ন, ঘোড়া-গাঁধা-বাহনসহ বহু যুদ্ধাস্ত্র ছিলো৷ নিয়মমতো সুলতান সেগুলো ভাগ করে দিলেন যোদ্ধাদের মাঝে৷ যুদ্ধলব্ধ সম্পদের মধ্যে ময়না, টিয়ে, বুলবুলি পাখির অসংখ্য খাঁচা দেখে সুলতান নির্বাক হয়ে গেলেন৷ কপাল কুঁচকে তিনি বিরক্তি প্রকাশ করলেন৷ বন্দি হওয়া মসুলের আমির সাইফুদ্দিনের একান্ত সহচর মুজহির উদ্দিন আকরা’কে ডেকে পাঠালেন৷ তাচ্ছিল্যের স্বরে বললেন, এইসব খাঁচাগুলি নিয়ে ভাগো এখান থেকে৷ তোমাদের আমির সাইফুদ্দিনকে বলবে, আপনি বরং এই পাখিগুলো নিয়ে তামাশায় মাতুন; যুদ্ধের ময়দান আপনার জন্য নয়৷

তথ্যসূত্র—
১৷ আন-নাসের সালাহউদ্দিন ওয়া-তাহরিরুল কুদস–
ড. ইবরাহীম আলি তরখান (২/২৬—৪০)
২৷ মাফরাজুল কারুব ফি-আখবারি বনি আইয়ূব–
জামালুদ্দিন মুহাম্মদ ইবনে সালিম (৪০—৪৩)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *